রিগ্রেশন সম্মোহন
রিগ্রেশন সম্মোহন (ইংরেজি: Regression Hypnosis) হল একটি বিশেষ সম্মোহন চিকিৎসা বা অনুসন্ধানমূলক পদ্ধতি, যেখানে কোন ব্যক্তিকে সম্মোহিত অবস্থায় তার বর্তমান জীবনের পূর্ববর্তী সময়ে বা কথিত পূর্বজন্মের অভিজ্ঞতায় "ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া" হয়। এই পদ্ধতির একটি জনপ্রিয় শাখা হল পূর্বজন্ম রিগ্রেশন (Past Life Regression বা PLR), যা এই বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে যে মানুষের আত্মা পুনর্জন্ম বা পুনর্জন্মবাদ গ্রহণ করে এবং পূর্বজন্মের স্মৃতি অচেতন মনে সংরক্ষিত থাকে। সম্মোহনের এই প্রয়োগ শুধুমাত্র কৌতূহল নিবারণের জন্য নয়, বরং বিভিন্ন মানসিক, শারীরিক বা আধ্যাত্মিক সমস্যা সমাধানের দাবিও করে থাকে।
সংজ্ঞা
রিগ্রেশন সম্মোহন হল একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া যেখানে একজন প্রশিক্ষিত চিকিৎসক বা থেরাপিস্ট সম্মোহনের মাধ্যমে ব্যক্তির সচেতন মনকে শিথিল করে তার অবচেতন মনের গভীরে প্রবেশ করতে সাহায্য করেন। এখানে 'রিগ্রেশন' শব্দের অর্থ 'পূর্বাবস্থায় ফিরে যাওয়া'। এই ফিরে যাওয়া দু'রকম হতে পারে: বয়স রিগ্রেশন (Age Regression), যেখানে ব্যক্তিকে তার বর্তমান জীবনের শৈশব বা কৈশোরে ফিরে নিয়ে যাওয়া হয়; এবং পূর্বজন্ম রিগ্রেশন (Past Life Regression), যেখানে ব্যক্তিকে তার বর্তমান জন্মের পূর্বের এক বা একাধিক জীবন সম্পর্কিত অভিজ্ঞতা অনুসন্ধানে উৎসাহিত করা হয়। অনেক অনুশীলনকারীর মতে, বর্তমান জীবনের ফোবিয়া, অকারণ ভীতি, দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা বা সম্পর্কের জটিলতার মূল কারণ পূর্বজন্মের কোনো ট্রমাটিক ঘটনায় নিহিত থাকতে পারে এবং রিগ্রেশন থেরাপির মাধ্যমে সেই মূল কারণ চিহ্নিত ও নিরসন সম্ভব।
ইতিহাস
ঊনবিংশ শতাব্দীতে সম্মোহনের জনক বলে পরিচিত ফ্রান্ৎস মেসমারের কাজেও রিগ্রেশনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তবে আধুনিক পূর্বজন্ম রিগ্রেশনের জনপ্রিয়তার সূচনা হয় মূলত দুই ব্যক্তির কাজের মাধ্যমে।
প্রথমজন হলেন আমেরিকান ব্যবসায়ী ও সম্মোহন চিকিৎসক মোরি বার্নস্টাইন। ১৯৫২ সালে, তিনি তার ক্লায়েন্ট ভার্জিনিয়া টাইকে সম্মোহিত করে "ব্রাইডি মারফি" নামে একটি ব্যক্তিত্বে রূপান্তরিত করেন, যিনি দাবি করেন তিনি ১৯ শতকের আয়ারল্যান্ডের একজন নারী। এই কাহিনী "দ্য সার্চ ফর ব্রাইডি মারফি" বই আকারে প্রকাশিত হয় এবং বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে, পূর্বজন্ম রিগ্রেশনকে জনমানসে একটি আলোচিত বিষয়ে পরিণত করে।
দ্বিতীয় ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হলেন আমেরিকান মনোচিকিৎসক ড. ব্রায়ান এল. ওয়েস। একজন প্রথাগত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে তিনি প্রথমে এ বিষয়ে সন্দিহান ছিলেন। কিন্তু ১৯৮০-এর দশকে তার এক রোগী 'ক্যাথরিন'-এর সম্মোহন চিকিৎসার সময়, যখন সে তার বহু পূর্বজন্মের বিবরণ দিতে শুরু করে এবং ওয়েসের ব্যক্তিগত জীবনের কিছু তথ্য জানাতে থাকে, তখন তিনি বিস্মিত হন। তার অভিজ্ঞতা তিনি "মেনি লাইভস, মেনি মাস্টার্স" বইয়ে লিপিবদ্ধ করেন, যা এই ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হয়ে ওঠে এবং পূর্বজন্ম থেরাপিকে একটি আধ্যাত্মিক নিরাময় পদ্ধতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
পরবর্তীতে, ড. মাইকেল নিউটন তার "জার্নি অফ সোলস" বইয়ের মাধ্যমে রিগ্রেশনকে আরও এগিয়ে নিয়ে যান। তিনি লাইফ বিটুইন লাইফস (LBL) বা জীবন-মধ্যবর্তী জীবন রিগ্রেশন পদ্ধতির বিকাশ ঘটান, যেখানে ব্যক্তিকে মৃত্যু ও পুনর্জন্মের মধ্যবর্তী আধ্যাত্মিক রাজ্যে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে আত্মার শিক্ষা, পর্যালোচনা এবং ভবিষ্যৎ জীবনের পরিকল্পনা হয় বলে দাবি করা হয়।
এছাড়াও, ডলোরেস ক্যানন নামক একজন আমেরিকান সম্মোহন চিকিৎসক তার "কিউর অফ সোলস" সিরিজের মাধ্যমে এই ধারণাটিকে আরও প্রসারিত করেন। তিনি দাবি করেন যে গভীর সম্মোহনের মাধ্যমে তিনি শুধু পূর্বজন্ম নয়, বরং ভিন্ন মাত্রা বা গ্রহের জীবন, এবং এমনকি পৃথিবীর ভবিষ্যৎ সম্পর্কিত তথ্যও পেয়েছেন।
পদ্ধতি
রিগ্রেশন সম্মোহন সাধারণত কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়:
- প্রস্তুতিপর্ব: থেরাপিস্ট ও ক্লায়েন্টের মধ্যে প্রাথমিক আলোচনা, লক্ষ্য নির্ধারণ এবং ভয় ও সংশয় দূর করা।
- শিথিলকরণ ও সম্মোহন প্রবেশ: একটি আরামদায়ক অবস্থানে বসে বা শুয়ে ক্লায়েন্টকে গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস ও মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করার নির্দেশনা দিয়ে হালকা থেকে মাঝারি স্তরের সম্মোহনে নিয়ে যাওয়া হয়।
- নির্দেশনা ও রিগ্রেশন: সম্মোহিত অবস্থায় থেরাপিস্ট ক্লায়েন্টকে তার বর্তমান সমস্যার উৎস খুঁজতে বা সরাসরি একটি পূর্বের সময়ে (যেমন: "তুমি এখন দশ বছরের বালক" বা "তুমি এখন যে সমস্যাটি অনুভব করছ তার উৎসের দিকে যাও") ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেন।
- অভিজ্ঞতা বর্ণনা ও অনুসন্ধান: ক্লায়েন্ট সাধারণত চাক্ষুষ দর্শন, শব্দ, অনুভূতি বা গন্ধের মাধ্যমে বিভিন্ন দৃশ্য বা ঘটনা বর্ণনা করতে শুরু করেন। থেরাপিস্ট নিরপেক্ষ প্রশ্ন করে এই অভিজ্ঞতাকে গভীরতর করতে সাহায্য করেন।
- পুনর্মিলন ও নিরাময়: যদি কোনো ট্রমাটিক ঘটনা উন্মোচিত হয়, তবে থেরাপিস্ট ক্লায়েন্টকে সেই ঘটনাকে পুনর্ব্যাখ্যা করতে, ক্ষমা করতে বা তা থেকে মুক্তি পেতে নির্দেশনা দেন। LBL রিগ্রেশনে আত্মার নির্দেশক বা মাস্টারদের সাথে কথোপকথনেরও দাবি করা হয়।
- সম্মোহন থেকে প্রত্যাবর্তন ও আলোচনা: ক্লায়েন্টকে ধীরে ধীরে সম্মোহন থেকে ফিরিয়ে আনা হয় এবং পুরো অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা করা হয়।
প্রকারভেদ
- বয়স রিগ্রেশন: বর্তমান জীবনের ভুলে যাওয়া বা দমিত স্মৃতি, বিশেষ করে শৈশবের ট্রমা পুনরুদ্ধারের জন্য ব্যবহৃত হয়। এটি কিছু প্রথাগত মনোচিকিৎসাতেও প্রয়োগ করা হয়।
- পূর্বজন্ম রিগ্রেশন (PLR): পূর্বজন্মের অভিজ্ঞতা অনুসন্ধানের জন্য ব্যবহৃত হয়, যার লক্ষ্য বর্তমান জীবনের সমস্যার উৎস খুঁজে বের করা বা আধ্যাত্মিক জ্ঞানলাভ।
- লাইফ বিটুইন লাইফস রিগ্রেশন (LBL): মৃত্যু ও পুনর্জন্মের মধ্যবর্তী অবস্থান সম্পর্কে জানার জন্য মাইকেল নিউটন প্রবর্তিত একটি গভীরতর আধ্যাত্মিক পদ্ধতি।
বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি
প্রথাগত বিজ্ঞান ও মনস্তত্ত্ব সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ রিগ্রেশন সম্মোহন, বিশেষ করে পূর্বজন্ম রিগ্রেশনকে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত পদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। সমালোচকদের যুক্তি হল:
- সম্মোহিত অবস্থায় উত্থাপিত "পূর্বজন্মের স্মৃতি" আসলে মস্তিষ্কের সৃষ্টি (কনফ্যাবুলেশন)। এটি চলচ্চিত্র, বই, লোককথা বা শৈশবে শোনা গল্পের টুকরো টুকরো স্মৃতি, কল্পনা এবং অবচেতন মনের আশা-আকাঙ্ক্ষার একটি জটিল মিশ্রণ হতে পারে।
- সম্মোহন নিজেই একটি পরিবর্তিত চৈতন্যের অবস্থা, যেখানে ব্যক্তি থেরাপিস্টের ইঙ্গিত ও নিজের বিশ্বাস অনুযায়ী গল্প তৈরি করতে বিশেষভাবে সংবেদনশীল হয়ে ওঠেন।
- ঐতিহাসিক গবেষণায় দেখা গেছে, রিগ্রেশনে প্রাপ্ত অনেক "পূর্বজন্মের বিবরণ" ঐতিহাসিক ভুলে ভরা, এবং সেগুলো বর্তমান জীবনে প্রাপ্ত তথ্যের সাথে মেলে।
- এটিকে একটি পseudoscience বা ছদ্মবিজ্ঞান হিসেবেও বিবেচনা করা হয়, কারণ এর দাবিগুলো পরীক্ষামূলকভাবে পুনরুৎপাদনযোগ্য নয় এবং প্রমাণের ভিত্তি ব্যক্তিগত সাক্ষ্যই হয়ে থাকে।
তবে কিছু গবেষক, যেমন ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. ইয়ান স্টিভেনসনের মতো মনোচিকিৎসক, শিশুদের স্বতঃস্ফূর্ত পূর্বজন্ম স্মৃতির কেস স্টাডি সংগ্রহ করে পুনর্জন্মের সম্ভাব্য প্রমাণ খোঁজার চেষ্টা করেছেন। তার কাজ বিতর্কিত হলেও কিছু অনুসারী তৈরি করেছে।
বাংলাদেশ ও ভারতীয় উপমহাদেশে চর্চা
পুনর্জন্মবাদ হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন এবং এমনকি কিছু সুফি মতবাদে একটি সুপ্রতিষ্ঠিত আধ্যাত্মিক ধারণা। তাই পূর্বজন্ম রিগ্রেশনের প্রতি এ অঞ্চলের মানুষের স্বাভাবিক কৌতূহল ও আগ্রহ রয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের শহুরে শিক্ষিত সমাজে এটি একটি ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয় বিকল্প থেরাপি বা আধ্যাত্মিক অনুশীলনে পরিণত হচ্ছে।
বাংলাদেশে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় শহরগুলিতে কিছু স্বতন্ত্র সম্মোহন চিকিৎসক ও স্পিরিচুয়াল হিলার পূর্বজন্ম রিগ্রেশন সেবা দিয়ে থাকেন। তারা প্রায়ই সেমিনার, ওয়ার্কশপের আয়োজন করেন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মাধ্যমে তাদের সেবার প্রচার করেন। ভারতে মুম্বাই, দিল্লি, বেঙ্গালুরু, চেন্নাইতে এর চর্চা আরও বিস্তৃত। ড. ব্রায়ান ওয়েস ও ড. নিউটনের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অনেক থেরাপিস্ট সক্রিয় আছেন। ভারতীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকান লেখক ও থেরাপিস্ট ড. দীপক চোপড়া-র রচনাও এই বিষয়ে আগ্রহ সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছে।
স্থানীয় সংস্কৃতিতে, অনেক সময় শিশুদের স্বতঃস্ফূর্ত পূর্বজন্মের দাবি গৃহীত হয় এবং পরিবার পূর্বের পরিবার খুঁজে বের করার চেষ্টা করে, যা রিগ্রেশনের একটি স্বাভাবিক প্রেক্ষাপট তৈরি করে। তবে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে, পুনর্জন্ম একটি গ্রহণযোগ্য ধারণা নয়। তাই বাংলাদেশের অনেক মুসলিম আলেম এই পদ্ধতিকে ধর্মবিরোধী ও ভিত্তিহীন বলে বিবেচনা করেন।
আইনি ও নৈতিক বিবেচনা
রিগ্রেশন সম্মোহন একটি সংবেদনশীল পদ্ধতি, যার সাথে গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক দায়িত্ব জড়িত:
- অপ্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ: অনেক অনুশীলনকারীর পর্যাপ্ত মনস্তাত্ত্বিক বা চিকিৎসা প্রশিক্ষণ নেই, যা ঝুঁকিপূর্ণ।
- মিথ্যা স্মৃতি সৃষ্টি: অদক্ষ থেরাপিস্ট অনিচ্ছাকৃতভাবে ক্লায়েন্টের মনে মিথ্যা বা বিকৃত স্মৃতি সৃষ্টি করতে পারেন, যা তার মানসিক অবস্থার অবনতি ঘটাতে পারে।
- শোষণের সম্ভাবনা: আধ্যাত্মিক সংকটে থাকা মানুষদের কাছ থেকে আর্থিক বা অন্য কোনো সুবিধা নেওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
- চিকিৎসার বিকল্প নয়: গুরুতর মানসিক রোগ (যেমন: সিজোফ্রেনিয়া, বাইপোলার ডিসঅর্ডার) এর জন্য এটি কোনোভাবেই প্রথাগত চিকিৎসার বিকল্প হতে পারে না। এমন ক্ষেত্রে এটি বিপজ্জনক হতে পারে।
- গোপনীয়তা রক্ষা: সম্মোহনে প্রাপ্ত অত্যন্ত ব্যক্তিগত তথ্য গোপন রাখা থেরাপিস্টের নৈতিক দায়িত্ব।
বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশেই সম্মোহন চিকিৎসার জন্য কোনও একক রেগুলেটরি বডি বা কঠোর আইনি কাঠামো নেই। তাই ব্যবহারকারীদের সতর্কতা ও থেরাপিস্টের যোগ্যতা যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি।